কোন বাছ বিচার না করে কেউ একজন ‘ছেলেধরা’ বা ‘ধর ধর’ বলে চিৎকার দিলেই হয়েছে! চারিদিক থেকে লোকজন জড়ো হয়ে কিল-ঘুষি-লাথি আর লাঠির আঘাতে মেরে ফেলছে জ্বলজ্যান্ত মানুষকে। এমনকি নারী শিশু কেউ বাদ যাচ্ছে না এমন নিষ্ঠুরতা থেকে।
গণপিটুনি সংস্কৃতি আগেও ছিল দেশে। ইদানিং যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা সত্যিকার অর্থে দেশটাকে নরকে পরিণত করেছে।
তসলিমা বেগম রেনুকে ২০ জুলাই বাড্ডার একটি স্কুলের সামনে বেধড়ক গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। তিনি ওই স্কুলে গিয়েছিলেন মেয়েকে ভর্তি করানোর জন্য। বছরের মাঝখানে ভর্তি করতে চাওয়ায় রটে যায় যে তিনি ‘ছেলেধরা’। প্রধানশিক্ষকের রুম থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে এনে এলাকাবাসী তাকে পায়ে পিষে মেরে ফেলেছে। ওই মায়ের দুই শিশু সন্তান এখন এতিম হয়ে গেল।
একই দিনে নারায়ণগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত হন বাক প্রতিবন্ধি রাজমিস্ত্রি সিরাজ। শিশু মেয়েকে সাথে নিয়ে তার স্ত্রী পালিয়ে গিয়ে নতুন বিয়ে করে। কিন্তু মেয়েকে মাঝে মাঝে দেখতে যেতেন বাবা সিরাজ। এটা পছন্দ ছিল না স্ত্রীর নতুন স্বামীর। ‘ছেলেধরা’ আখ্যা দিয়ে এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে পিটিয়ে মেরেছে পাষুণ্ড।
কৌশলে ডেকে এনে ২২ জুলাই ভোরে স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক আবুল কালাম আযাদকে ডাকাত আখ্যা দিয়ে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া একের পর এক খবর আসছে গণপিটুনিতে আহত ও নিহত হওয়ার।
এই চিত্রগুলো অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিরীহ গণপিটুনির ছাড়াও পরিকল্পিত গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। সাত পাঁচ না ভেবে বা অপরাধীকে পুলিশে না দিয়ে আশপাশের জনগণ দিচ্ছে গণপিটুনি।
হ্যাঁ, অনেকেই আছেন যারা গণপিটুনিতে অংশ নেননি বা দোষী নন। কিন্তু যেসব দুষ্টু লোক গণপিটুনি দেয় তারাই এখন সমাজে ছড়ি ঘুরাচ্ছে। সমাজে এখন ভদ্র, সজ্জন ও সমঝদার মানুষদের কোনো প্রভাব ও সম্মান নেই।
এছাড়া গণপিটুনির ঘটনা প্রমাণ করে এই সমাজের মানুষের পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি আস্থা কম। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার মধ্যে তারা সমাধান খুঁজে। পিটুনির সময় ‘পুলিশে খবর দেন’ আওয়াজ তুললে সবাই হইচই করে ওঠে। ‘অর্থের বিনিময়ে অপরাধী পার পেয়ে যায়’ এমনই মন্তব্য আসতে থাকে।
গণপিটুনি আরেক প্রকারের বিচার বহির্ভুত হত্যা। ক্রসফায়ারের নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের ন্যায় শতশত মানুষের উপস্থিতিতে নীরিহ কিবা অপরাধী ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা যেন সমাজ হজম না করে ফেলে।
আমি এহেন ঘটনার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ এবং সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।