বিপুল ঘনবসতির ঢাকায় হাজারো সমস্যা। নানা জটিলতার সমস্যা মোকাবেলা করে উন্নয়নের পথে রাজধানীকে এগিয়ে নেয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকার এক ঝাঁক সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব ও কর্মী।
মেগাসিটি ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। ওয়ার্ল্ড এ্যাটলাসের তথ্য মতে জনসংখ্যার বিচারে এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম নগরী। জনঘনত্বের বিচারে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ। ১১৮ বর্গমাইল আয়তনের এই শহরে প্রতি বর্গমাইল এলাকায় ১ লক্ষ ২০ হাজার লোকের বাস।
ঢাকা মসজিদের শহর হিসেবে পরিচিত। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ঢাকা হলো রিকশার শহর। এই নগরীতে ১০ লাখের বেশি রিকশা চলাচল করে।
সপ্তদশ শতাব্দীতে পুরানো ঢাকা মুঘল সাম্রাজের সুবহে বাংলা (বাংলা প্রদেশ) এর প্রাদেশিক রাজধানী ছিল। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে এই শহর জাহাঙ্গীরনগর নামে পরিচিতি লাভ করে। বিশ্বব্যাপী মসলিন উৎপাদনের কেন্দ্র ছিলো ঢাকা এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীগণ এখানে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসতেন।
মূলত আধুনিক ঢাকা শহরের বিকাশ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শাসন আমলে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পরে ঢাকা নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পরে ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক রাজধানীতে পরিণত হয়। ১৯৫০-৬০ সালের মধ্যে এই শহর বিভিন্ন সামাজিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে ঢাকা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঘোষিত হয়।
আমাদের সংবিধানের ৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। আধুনিক ঢাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান কেন্দ্র। ঢাকা মহানগরীর প্রধান প্রধান দর্শনীয় স্থান হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবন, ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় শহীদ মিনার, জাতীয় চিড়িয়াখানা, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা ইত্যাদি।
রাজধানী ঢাকার যত সমস্যা
রাজধানী শহর হলেও এখানে অপরিকল্পিত নগরায়ন, বায়ু ও শব্দ দূষণ, সেকেলে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা, অনুন্নত রাস্তাঘাট, মানহীন যানবাহন, অপর্যাপ্ত ও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জনসংখ্যা অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা ও ভঙ্গুর শিক্ষা অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত খেলার মাঠ, ক্রীড়াসামগ্রীর অপ্রতুলতা, সীমাহীন যানজট এবং জনসংখ্যা অনুসারে নাগরিক সুবিধার অপ্রতুলতা বেশ প্রকট।
সাম্প্রতি ঢাকার পরিবহন, যোগাযোগ ও গণপূর্ত ব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও তা এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক মানের হয়ে ওঠেনি। এই নগরীতে বিদেশী বিনিয়োগ টানতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও অবকাঠামো প্রয়োজন তাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রচুর মানুষ ঢাকায় আসেন জীবিকার সন্ধানে। এ কারণে ঢাকা হয়ে উঠেছে বিশ্বের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান নগরী। কিন্তু জনসংখ্যা অনুসারে সেবার মান বাড়েনি বরং কমেছে।
সঙ্গত কারণেই এই মেগাসিটির নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি ও সেবার মান বিশ্বমানে নিতে হলে যুৎসই নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, নগরীর অবকাঠামো, পরিবহণ, পরিষেবা ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক বিষয়াবলী অন্তর্ভূক্ত থাকা দরকার। নাগরিক সেবা কীভাবে সুষ্ঠুভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, অবকাঠামোগত বিন্যাস ও স্থানভেদে ভূমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, নগরীকে মশামুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা থাকা এবং বাস্তবায়ন করা দরকার।
নগর সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ, কৌশলগত চিন্তা, স্থাপত্য, নগর নকশা, জনমত নিরীক্ষণ, নীতিমালা প্রণয়ন নগর পরিকল্পনার অংশ। এসব কাজে নগর পরিকল্পনাবিদদের অন্তর্ভূক্ত করা জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন মেগাসিটিতে নগর ব্যবস্থাপনায় যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেখান থেকে পর্যালোচনা করে আমাদের জন্য প্রযোজ্য বিষয়গুলো খুঁজে বের করতে হবে। সবার আগে নাগরিক পরিসেবার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
রাজধানী ঢাকার অন্যতম সমস্যা যানজট। জনসংখ্যা অনুপাতে অপ্রতুল ও অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট এর প্রধান কারণ। অনুমোদন ও মানহীন যানবাহনও এক্ষেত্রে বড় সমস্যা। উন্নত বিশ্বের নগর ও পরিবহন সুবিধার দিকে তাকালে এ ক্ষেত্রে আমরা যে শুধু পশ্চাদপদই তা নয় বরং এখনও সনাতনী যুগে আছি তাই প্রমাণিত হয়।