শেষ পর্ব।।
আজ ৬ই ফেব্রুয়ারি। শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। শিবিরের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সারাদেশের লক্ষ-লক্ষ সমর্থক, সূধী-শুভাকাঙ্খিসহ সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দকে আমার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাই। বিশেষ করে এই শহীদি কাফেলার বীর সেনানী যারা ইসলামী আদর্শকে বিজয়ী করার আন্দোলন সংগ্রামে নিজের প্রিয় জীবনকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করেছেন সেই সব বীর শহীদানদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তাদের পরিবার-পরিজন ও আত্নীয়-স্বজনের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সর্বাঙ্গিন মঙ্গল কামনা করছি।
গত পর্বে শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সাথে পরিচয় প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছিলাম। কার্যকরী পরিষদের প্রথম অধিবেশন শেষে নিজের কর্মস্থল সিলেটে ফিরে গেলাম। যতটুকু মনে পড়ে, মার্চ মাসের শুরুর দিকে একটি সাংগঠনিক প্রোগ্রামে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করছিলাম। তারিখটি ছিল ১৯৯৯ সালের ৬ই মার্চ। প্রোগ্রাম চলাকালিন অবস্থায় সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে তৎকালিন কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল জনাব এহসানুল মাহবুব জোবায়ের ভাই ফোন করে জরুরী ভিত্তিতে আমাকে মৌলভীবাজার সফর করার বিষয়ে অবহিত করলেন। উল্লেখ্য ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৭ প্রায় ৯ বছর আমার সাংগঠনিক জীবন মৌলভীবাজারে অতিবাহিত হয়েছে। তার মধ্যে ১৯৯৫-১৯৯৭ পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের মৌলভীবাজারের জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। স্বাভাবিক কারণেই মৌলভীবাজারের মাটি ও মানুষের সাথে আমার অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো।
১৯৯৯ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে মৌলভীবাজার সরকারী কলেজে শিবির এবং ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে বন্ধুভাবাপন্ন দু’টি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। মূলত এই দুটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে উদ্ভুত পরিস্থিতির মীমাংসার জন্য আমাকে কেন্দ্র থেকে সেখানে সফরের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। নির্দেশ পালনার্থে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সফর সংক্ষিপ্ত করে কয়েকজন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দেরি না করে সরাসরি মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে সেখানে রাত্রি যাপন করি। পরের দিন সকালে ছাত্রশিবির এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের সাথে ঘটনার পূর্বাপর বিশ্লেষণের লক্ষ্যে বৈঠকে বসি। বৈঠকটি মৌলভীবাজার শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তৎকালীন জেলা জামায়াতের আমীর শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় বাইতুলমাল সম্পাদক শ্রদ্ধেয় জনাব দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম মতলিবের বাসভবনের নিচে কমিউনিটি সেন্টারে শুরু হয়েছিলো।
প্রোগ্রাম শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসলো, তৎকালীন আওয়ামী সরকারের পুলিশ বাহিনী আমাদেরকে গ্রেফতার করার লক্ষ্যে জনাব সিরাজুল ইসলাম মতলিবের বাসভবন ঘেরাও করে ফেলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ বাসভবনের ভিতরে প্রবেশ করে আমাদেরকে গ্রেফতার করে। সে সময়ের একটি বিশেষ দৃশ্য মনে পড়লে আজও হাসি পায়। পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে হঠাৎ করে একটি কালো ব্যাগ আমার সামনে উপস্থাপন করে আমার ছবি উঠাতে শুরু করলো। আমি পুলিশকে জিজ্ঞেস করলাম যে, এই ব্যাগ কার এবং কেন ছবি তুলছেন? তারা জানালো যে, এই ব্যাগে বিস্ফোরক রয়েছে এবং এটা নাকি আমি নিয়ে এসেছি। আমি পুলিশকে একটু ধমকের স্বরে বললাম, মিথ্যারও একটা লিমিট থাকা উচিত। আপনারা ব্যাগ এনে আমার সামনে ধরিয়ে দিয়ে মিথ্যার বেসাতি করবেন এটা হতে পারে না।
আমি তাদেরকে দিয়েই ছবি ডিলিট করালাম এবং তারা ব্যাগও আমার সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। তারপর তারা আমাকে হ্যান্ডকাপ পড়াতে চেষ্টা করলে, উপস্থিত আমার সঙ্গি জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তা না করার জন্য পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অবশেষে পুলিশ অবশ্য হ্যান্ডকাপ ছাড়াই তাদের গাড়িতে তুলে আমাকে থানায় নিয়ে যায়। গ্রেফতারের অল্প কয়েকদিন পরেই খবর পেয়ে ঢাকা থেকে যিনি আমাদের খোঁজ নিতে মৌলভীবাজারে ছুটে গিয়েছিলেন এবং কারাগারের ভিতরে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে পরম সান্তনার বাণী শুনিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নেতা শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। শিবিরের এই ৪১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কিংবদন্তি কেন্দ্রীয় সভাপতি শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে জানাই স্বশ্রদ্ধ সালাম।
লেখকঃ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।