শীতের এক প্রশান্ত প্রত্যুষেই অনেকটা হঠাৎ করেই রওয়ানা দিয়েছিলাম বৃহত্তর মোমেনশাহী জেলার অন্তর্গত শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়া গ্রামের দিকে। আমার এই সফরের তেমন কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। অনেকটা কাকতালীয়ই ছিল সফরটি। মূলত প্রিয় সংগঠনের আদেশ পালনই ছিল এই সফরের মূল উদ্দেশ্য। রৌদ্রতাপহীন কুয়াশা ঢাকার রাজপথ দিয়ে আমাদের এই অভিযাত্রা। শীতের তীব্রতা অসহনীয় পর্যায়ের না হলেও একেবারে কমও ছিল না। তাই শীতের কমল পরশটা বেশ উপভোগ্যও হয়ে উঠেছিল আমাদের কাছে। যাত্রাটা শুরু হয়েছিল রাজধানী শহর ঢাকা থেকেই। দিনটা চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার।
পাঠকগণ হয়তো কিছুটা হলেও বিস্মিত হবেন যে, আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে এত দৃষ্টিনন্দন ও ইতিহাস খ্যাত জায়গা থাকতে শেরপুর নিয়ে আমার এতো অতি আগ্রহ কেন? উত্তরটা সহজ হলেও প্রকাশটা মোটেই সহজসাধ্য নয়। কারণ, এই উত্তরের মধ্যে জড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস; কাল পরিক্রমা। শত সহস্র বছরের রক্তপিচ্ছিল এক পথ পরিক্রমার সুদীর্ঘ এক ফিরিস্তি। যে ধারাবাহিকতায় অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শাহাদাতকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করেছেন মর্দে মুমিনগণ। অবলীলায় নিজেদের উষ্ণ লোহ ঢেলে দিয়ে যারা আল্লাহর জমিনকে সিক্ত, উর্বর, সতেজ ও ফলবতী করে গেছেন তাদের একজনের সাথে জড়িয়ে শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়া গ্রাম। তিনি হলেন বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের কিংবদন্তি প্রবাদ পুরুষ শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। যিনি ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে সত্য বিস্মৃত হননি বরং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়-ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আর্ত-মানবতার মুক্তির জয়গান গেয়ে গেছেন। যার আত্মত্যাগ ও কোরবানীর কথা বিস্মৃত হবার নয়; হওয়া যায় না।
বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা তথা বিশ্ব ইসলামী আন্দোনের অগ্রসৈনিক শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়া গ্রামে এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম ইনসান আলী সরকার ও মাতা মরহুমা সালেহা খাতুন। তিনি কুমরী কালিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনার পর শেরপুর জিকেএম ইন্সটিটিউশনে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। অষ্টম শ্রেণীতে তিনি আবাসিক বৃত্তি পান। ১৯৬৭ সালে জিকেএম ইন্সটিটিউশন থেকে ৪টি বিষয়ে লেটারসহ এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং আবাসিক বৃত্তি লাভ করেন।
এছাড়াও তিনি ছাত্রজীবন হতেই একজন বিনয়ী ভদ্র অমায়িক মানুষ হিসেবে সর্বজনবিদিত। ১৯৭১ (১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত) সালে মোমেনশাহী নাসিরাবাদ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৩ (১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত) সালে ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে ডিস্ট্রিংশনসহ বিএ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে কৃতিত্বের সাথে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন। মূলত শহীদ কামারুজ্জামান তার মেধা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব, দূরদর্শিতা, শ্রম ও সময় সবই ইসলামী আন্দোলনের জন্য কুরবানী করে গেছেন। যা বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁকে অমর ও অজেয় করে রেখেছে।
আমরা খুব ভোরেই যাত্রা শুরু করেছিলাম। তাই রাস্তাঘাটে খুব একটা জানজট পরিলক্ষিত হয়নি। আমরা সকাল ৯.০০টার মধ্যেই মোমেনশাহী শহরে পৌঁছে যাই। মোমেনশাহী শহরের অদূরেই শেরপুর যাওয়ার পথে বৃহত্তর মোমেনশাহীর জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার কৃতি সন্তান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মোমেনশাহী অঞ্চল পরিচালক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারী শ্রদ্ধেয় ড. সামিউল হক ফারুকী’র বড় ভাইয়ের বাসায় সকালের নাস্তা গ্রহণ করি। তাঁর বড় ভাই, ভাবী, ভাতিজা ও নাতিদের আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করেছিলো। মূলত জনাব ড. সামিউল হক ফারুকী’র সফর টীমের সদস্য হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে এই সফর অনুষ্ঠিত হয়।
সকালের নাস্তা শেষ করে পুনরায় শেরপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। গাড়ি যতদূর সামনে অগ্রসর হচ্ছিলো ডানে-বামে তাকিয়ে স্মৃতির সাগরে অবগাহন করছিলাম। মনে পড়ে ১৯৯৯ সালের কথা। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকার আল-ফালাহ মিলনায়তনে এসেছিলাম। সেদিনই পরিচয় পর্বের এক পর্যায়ে শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সাথে অন্তরঙ্গ পরিবেশে আমার প্রথম কথা হয়। পরিচয় পর্ব শেষে আদর করে পিঠে হাত বুলিয়ে তাঁর বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ দিয়েছিলেন। (চলবে)
লেখকঃ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।